হিন্দোল ভট্টাচার্য






কৃষক

আগুনের মধ্যে বসে আমরা তবু ফসল কাটার স্বপ্ন দেখতে পারি;
দেহ অত সহজে পোড়ে না। পুড়লেও মরতে সময় নেয়।
যুদ্ধ করেছি এতদিন, মৃত্যুর সামনে বসে গান গেয়েছি প্রেমের,-
মন থেকে খসে গেছে সমস্ত বর্ম। পুরোহিত এসে বলেছেন
এইবার নিজের শ্রাদ্ধ করে যাওয়ার সময় হয়েছে। বীজ গুনেছি,
মাটির উপরে রোদ আর জলের মধ্যে হেঁটে গেছে উত্তরপুরুষ।
আমরা সমাধি থেকে উঠে এসেছিলাম একদিন,- আমরা জল থেকে
উঠে এসেছিলাম একদিন। আমরা আগুন থেকে উঠে এসেছিলাম একদিন।
আজ বুকের ওপর দিয়ে ট্রেন চলে গেলেও আদিম জরাসন্ধের মতো
জেগে উঠি। জন্ম নেই যার, মৃত্যু তার কীভাবে হবে হে উত্তরপুরুষ?
চাঁদের আলোর মতো মায়াবী এ জীবন নিয়ে এসো গান বাঁধি।
     




সন্দেহ

প্রতিটি মৃত মানুষের
চাদর সরিয়ে
মানুষ দেখে নিচ্ছে এই দেহ
তারই ছিল কিনা

আশ্চর্য জীবন...

এখন আয়নার সামনে গেলেও
ভয় হয়

সরে যাই
যেন সেও দূরে সরে যায়


        



সংক্রান্তি


আমাদের দেখা হবে কোনওদিন, এই কথা ছিল;

এখন রাস্তায় কোনও ট্র্যাফিক পুলিশ নেই,-
প্লাস্টিক জড়ানো দেহ প'ড়ে
আমাদের বাড়িগুলো এতদূরে কখনও ছিল কি?

টিমটিম করছে বাল্ব, কারোর পায়ের শব্দ নেই
একটি সবুজ আলো জ্বলে আছে
ট্র্যাফিক সিগন্যালে

মানুষ ভূতুড়ে মুখে জানলা থেকে দেখে নিচ্ছে
কার ছায়া পড়ে আছে, খিদে না ব্যাধির?

তোমার খিদের কাছে আমার বিষাদ কিছু নয়

আমাদের দেখা হবে কোনওদিন, এই কথা ছিল
এখন গোপনে জানি
তোমার আমার মধ্যে একপৃথিবী মৃত্যু শুয়ে আছে







প্রার্থনা

থামো
থামো এবার

মানুষ যদি না থাকে
কে তোমায় নিয়ে কবিতা লিখবে
কে তোমায় নিয়ে গান লিখবে
কে তোমার ছবি আঁকবে
তৈরি করবে রূপকথা
দর্শন
ধর্ম
আর আশ্চর্য সব স্বপ্ন?

থামো
থামো এবার

মানুষ যদি না থাকে
কে তোমায় ভয় পাবে আর






গ্রাস

একথালা মৃত্যু এসে মানুষকে বলছে, তুমি খাও
মানুষ নিজের লাশ ঘৃণা করে মৃত্যুর পরেও
কে যে আসে দরজায়, কে যে চলে যায়
মানুষ পেটের দাস, মৃত্যু খায়, পুনর্জন্ম মেখে

লাশ প্লাস্টিকেই মোড়া, পায়ে শুধু কয়েকটি নম্বর
এটুকু জীবন তবে? এটুকুই দিবাস্বপ্ন ছিল?

মানুষ ও মানুষের লাশ মুখোমুখি
হাতের উপরে হাত রাখে। আকাশে সুকান্ত চাঁদ
বোঝে এই পৃথিবীতে কেন তারা সময় পায়নি!

যেভাবে এ পৃথিবীতে
একটি হাসপাতাল মুহূর্তেই মর্গ হয়ে যায়




          


এপিটাফ

আমি মরলে তুমি জানতে পারবে না
তুমি মরলে আমি জানতে পারব না

চুপিচুপি মৃতদেহ সরিয়ে ফেলা হবে
এবং পৃথিবী হবে নিরাপদ, কারণ
আর কোনো মানুষের সঙ্গে তার সহবাস
হবে না কোথাও

তাই বোবা হয়ে থাকো,--
জীবন নশ্বর
মানুষ নিহত হলে মৃত্যুও পরাজিত হয়







ভাইরাস

এক রাগী ক্ষুধার্ত মাংসাশী শয়তানের মতো
পেশাদার খুনীর চেয়েও শান্ত
হিটলারের চেয়েও উন্মাদ
স্তালিনের চেয়েও নীরব
এক অবধারিত নিয়তির মতো
সে, অপেক্ষা করছে
মেরুদণ্ডের ভিতরে যেন ভূতের সিনেমার ক্লাইম্যাক্স
মাঠের উপরে না-কাটা ধানের মধ্যে
সে, অপেক্ষা করছে







নবান্ন

রাস্তার উপরে লাশ
লাশের উপরে রাস্তা

শ্বাস ও কষ্টের মধ্যে জমে যাচ্ছে খিদের হাইফেন

অকালবোধন



    


দুখজাগানিয়া

এক প্রাচীন ড্রাকুলা যেন ঘুম থেকে উঠে পড়ছে
দুঃস্বপ্নের ভিতর

খোপ কাটতে কাটতে ঠিক
নিজের শরীরের মাপে ঘর তৈরি করছে মানুষ

মৃত্যুর সঙ্গে মানুষের আর
তেমন শত্রুতা নেই

ভয় শুধু কেউ যদি ছুঁয়ে চলে যায়!


  



অন্নপূর্ণা

এই সব সত্যি কথা তোমায় বলতে চাইনি। বরং ফুল পাখি আর বসন্ত নিয়ে কয়েকছত্র পদ্য লিখলে ভাল হত। অথবা কালবৈশাখী নিয়ে আত্মকথা। এখন দোকানগুলো অন্ধকার। রাস্তায় ঘুম থেকে উঠে পড়েছে উনবিংশ শতাব্দীর লাশ। আর সে কত পাখির ডাক তোমায় কী বলব! সারি সারি মৃতদেহের উপর এসে পড়েছে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম সূর্যের আলো। আমি এত আলো দেখিনি। এত আলো দেখেনি নিমগাছ। হাওয়ার ভিতরে পলাশের স্বাধীন লাল রঙ উড়ছে অনেকদূর। এই সব সত্যি কথা শুনলে তুমি আমায় নির্বাসন দিতে পার।

অন্ধকার সত্য নয়। আলো সত্য নয়। এই মৃত্যুও সত্য নয় হে যোদ্ধা। আমাদের সব যুদ্ধ হল অপেক্ষার এক একটা শিবির। যেখানে থমথম করছে ভয়। লাশ কখনও লাশের দিকে তাকাতে পারে না। আর তাই এই ভয় বোবা, শব্দহীন, চুপ! আজ বুঝি, নীরো কেন বেহালা বাজান রোম পুড়ে যাওয়ার সময়। যেতে দাও। তুমি প্রবাহ, কিন্তু প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় তোমার জানা নেই। আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে যে, তার সঙ্গে কয়েক পাক ঘুরে এসো সন্ধ্যাবেলা। ওরা সন্ধ্য্যাবেলাই আসে। বিষাদ যেখানে রাস্তার পাশে সিগারেট ধরায়।

বলতে চাইনি এতো সত্যি কথা। মৃত্যুর কাছে এলে, মনে হয়, আমি কেন আরও বেশি করে দেখলাম না আমার ছায়া? কেন দেখলাম না কত উদ্দেশ্যবিহীন রাত উদ্দেশ্যবিহীন দিন আমার শরীর থেকে বয়ে চলে যাচ্ছে এক হিংস্র শ্বাপদের মতো। কেউ না কেউ তার ডাক শুনতে পায়। কেউ বলে তক্ষক, কেউ বলে নিশি। আবার নিয়তিও বলে কেউ। আমি  গন্ধ পাই একটি কুটিরে ভাতের। প্রাচীন উনুন ধরিয়েছে কেউ। খিদে পায়। এটুকুই সত্যি। যার কথা তোমায় বলিনি।







জলসাঘর

প্রতিটি ইঁটের গায়ে লেগে থাকে তোমার জীবন
প্রতিটি ভাষার মধ্যে, প্রতি অক্ষরেই
অসমাপ্ত কবিতার শিরোনামহীন কোনও মাটির ফলকে
লেগে থাকে তোমার জীবন
বহুবছরের শ্যাওলা যেন জমে জমে আজ প্রবালপ্রাচীর
কত রাস্তা চলে গেছে এই পথ দিয়ে তুমি জানো?
একটি গানের মধ্যে আরও কত গান মিশে থাকে
একটি মৃত্যুর মধ্যে কত মৃত্যু
একটি নদীর মধ্যে কত পাড়
কত যাত্রাপালা, কত বাউলের একতারার সুর
কত প্রসববেদনা
জীবন আসলে এক ভাঙা রাজবাড়ি যার
পুকুরে আলেয়া দেখা যায়।
মৃত্যু তার কাছে আসে, একটি ভিখিরি যেন-
তারও ছিল ধানক্ষেত, ফসল কাটার ঋতু, খেজুরের রস।

আপ্যায়ন করো তাকে, পাত পেড়ে বসাও দালানে। 















No comments

Powered by Blogger.